চিঠি দিও প্রতিদিন, চিঠি দিও
নইলে থাকতে পারবো না।’
গানের এই অমর পঙ্ক্তি একসময় মানুষের হৃদয়ে গভীর আবেগের ঢেউ তুলত। প্রিয়জনের কাছ থেকে একটি চিঠি পাওয়ার অপেক্ষায় কত যে দিন, কত যে রাত কেটেছে—তার হিসাব নেই। ডাকপিয়নের সাইকেলের ঘণ্টা কিংবা দূর থেকে তার হাঁক শুনলেই ছুটে যেতেন মানুষ। হাতে লেখা একটি চিঠি তখন হয়ে উঠত ভালোবাসা, আবেগ, অপেক্ষা আর অনুভূতির সবচেয়ে মূল্যবান বাহন।
আজ বিশ্ব চিঠি দিবস। অথচ সময়ের স্রোতে চিঠি লেখার সেই দিন যেন হারিয়ে গেছে। চিঠির জায়গা দখল করে নিয়েছে মোবাইল ফোন, ই-মেইল, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপসহ নানা ধরনের তাৎক্ষণিক যোগাযোগমাধ্যম। মুহূর্তেই পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পৌঁছে যাচ্ছে বার্তা। অপেক্ষার অবসান হয়েছে, কিন্তু সেই অপেক্ষার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা আবেগটুকুও কি হারিয়ে গেছে?
একসময় চিঠি ছিল মানুষের সম্পর্কের অন্যতম সেতুবন্ধন। দূর প্রবাসে থাকা সন্তান মায়ের কাছে লিখত—‘মা, ভালো আছি।’ স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে চলত ভালোবাসার চিঠি। প্রেমিক-প্রেমিকার কাছে চিঠি ছিল মনের গোপন কথাগুলো জানানোর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়। বন্ধুদের চিঠিতে থাকত স্মৃতি, অভিমান, হাসি-কান্না আর বন্ধুত্বের গল্প। সরকারি-বেসরকারি নানা কাজেও চিঠিই ছিল যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম।
চিঠির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল এতে সময় দেওয়া হতো। একটি চিঠি লিখতে মানুষ বসত, ভাবত, শব্দ বেছে নিত, নিজের অনুভূতিকে সাজাত। প্রিয় মানুষের হাতের লেখা দেখেই যেন তার উপস্থিতি অনুভব করা যেত। চিঠির কাগজে থাকত মানুষের স্পর্শ, কখনো সুগন্ধি, কখনো অশ্রুর দাগ; থাকত দীর্ঘ অপেক্ষার গল্প।
কিন্তু প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে বদলে গেছে মানুষের যোগাযোগের ধরন। এখন একটি ‘হাই’, ‘কেমন আছ?’ কিংবা একটি ইমোজিই অনেক সময় কথোপকথনের শুরু ও শেষ। মনের কথা জানানোর জন্য কয়েক মিনিট অপেক্ষা করাও যেন এখন কঠিন। চিঠির জন্য যেখানে দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হতো, সেখানে এখন কয়েক সেকেন্ডের বিলম্বও অনেকের কাছে অসহ্য।
তবু চিঠি পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ দলিল, সাহিত্যিকের পাণ্ডুলিপি, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, প্রেমের চিঠি কিংবা পুরোনো পারিবারিক চিঠিগুলো আজও মানুষের কাছে অমূল্য সম্পদ। কারণ চিঠি শুধু বার্তা বহন করে না- চিঠি বহন করে একটি সময়, একটি মানুষ এবং একটি জীবনের গল্প।
তবে, চিঠির গল্প ইউরোপ-আমেরিকায়ও পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। ব্যক্তিগত চিঠি লেখার প্রবণতা কমে এলেও সেখানে চিঠির বন্যা এখনো বয়ে যায়। প্রতিদিন অসংখ্য মেইলবক্সে জমা হয় নানা ধরনের চিঠি। ব্যাংকের চিঠি, বীমা প্রতিষ্ঠানের নোটিশ, সরকারি কাগজপত্র, বিল, করসংক্রান্ত নথি, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অফার, শুভেচ্ছা কার্ড কিংবা ব্যক্তিগত আমন্ত্রণপত্র। ডাকবাহকের গাড়ি ও মেইলবক্স এখনো সেখানে দৈনন্দিন জীবনের দৃশ্যপটের অংশ।
অর্থাৎ, চিঠি এখানে হারিয়ে যায়নি; বদলে গেছে চিঠির ধরন ও প্রয়োজন। ব্যক্তিগত অনুভূতির চিঠির জায়গা অনেকটাই নিয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রয়োজনীয় যোগাযোগ। প্রতিদিনের মেইলবক্স খুললেই তার প্রমাণ মেলে।
আর আমাদের উপমহাদেশে যেন ঘটেছে অনেকটাই উল্টো ঘটনা। ব্যক্তিগত চিঠির পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক চিঠির ব্যবহারও ক্রমেই কমেছে। মোবাইল ফোন, ই-মেইল, এসএমএস ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মুহূর্তের মধ্যে যোগাযোগের সুযোগ করে দিয়েছে। ফলে ডাকপিয়নের অপেক্ষা, খামের ওপর পরিচিত হাতের লেখা কিংবা চিঠির ভাঁজ খুলে প্রিয় মানুষের কথা পড়ার সেই আবেগ আজ অনেকটাই স্মৃতির পাতায়।
তবু ইউরোপ-আমেরিকার মেইলবক্স কিংবা আমাদের পুরোনো ডাকঘরের দিকে তাকালে একটি বিষয় স্পষ্ট—চিঠি আসলে হারিয়ে যায়নি, শুধু তার ভাষা বদলে গেছে।
একসময় চিঠি মানুষের হৃদয়ের খবর বহন করত। এখন অনেক চিঠি বহন করে জীবনের প্রয়োজনীয় খবর। কিন্তু একটি হাতে লেখা চিঠি এখনো অন্যরকম। কারণ কাগজের ওপর লেখা কয়েকটি শব্দের সঙ্গে মিশে থাকে একজন মানুষের সময়, স্পর্শ, অনুভূতি ও অপেক্ষা।
হয়তো এ কারণেই বহু বছর পরও পুরোনো কোনো চিঠি হাতে নিলে মানুষ ফিরে যায় অতীতে। চোখের সামনে ভেসে ওঠে হারিয়ে যাওয়া মানুষ, ফেলে আসা দিন, পুরোনো সম্পর্ক আর এক টুকরো ভালোবাসা।
চিঠির প্রয়োজন হয়তো কমেছে, যোগাযোগ হয়েছে সহজ। কিন্তু চিঠির অনুভূতির কি সত্যিই প্রয়োজন ফুরিয়েছে?
আজ বিশ্ব চিঠি দিবসে তাই সেই গানের কথাই যেন আবার মনে পড়ে—
‘চিঠি দিও প্রতিদিন, চিঠি দিও
নইলে থাকতে পারবো না।’
নিউজটি আপডেট করেছেন : Suprobhat Michigan

নিজস্ব প্রতিনিধি :